ঘরোয়া পদ্ধতিতে থাইরয়েড কমানোর উপায়

থাইরয়েড হরমোন আমাদের শরীরের বিপাক, বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। থাইরয়েডের সমস্যা হলে এই হরমোনের মাত্রা কম বা বেশি হতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যার মধ্যে হাইপোথাইরয়েডিজম এবং হাইপারথাইরয়েডিজম অন্যতম।

হাইপোথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এতে শরীরের বিপাক কমে যায়, ফলে শরীরে ক্লান্তি, দুর্বলতা, শীতকাতরতা, ওজন বৃদ্ধি, ত্বকের শুষ্কতা, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।

হাইপারথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা বেশি হয়ে যায়। এতে শরীরের বিপাক বেড়ে যায়, ফলে শরীরে কাঁপুনি, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, ওজন হ্রাস, ঘাম, খিটখিটে মেজাজ, অনিদ্রা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।

থাইরয়েডের সমস্যার চিকিৎসা নির্ভর করে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রার উপর। হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসায় থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি দেওয়া হয়। হাইপারথাইরয়েডিজমের চিকিৎসায় থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন কমানো বা বন্ধ করার জন্য ওষুধ, তেজস্ক্রিয় আইওডিন থেরাপি বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

থাইরয়েড হরমোন বেড়ে গেলে কি কি লক্ষণ দেখা দেয়?

থাইরয়েড হরমোনের লক্ষণ

থাইরয়েড হরমোন বেড়ে গেলে শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা দেয় সেগুলিকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়। হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলি সাধারণত ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং এগুলির তীব্রতা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।

হাইপারথাইরয়েডিজমের কিছু সাধারণ লক্ষণ হল:

  • ওজন হ্রাস
  • উদ্বেগ এবং অস্থিরতা
  • ঘুমের সমস্যা
  • দ্রুত হৃদস্পন্দন
  • অতিরিক্ত ঘাম
  • গরম সহ্য করতে না পারা
  • হাতে কাঁপুনি
  • মাথা ব্যথা
  • দৃষ্টি সমস্যা

হাইপারথাইরয়েডিজমের আরও কিছু গুরুতর লক্ষণ হল:

  • অনিয়মিত মাসিক
  • গর্ভপাত
  • ক্লান্তি
  • শক্তি হ্রাস
  • পেশী দুর্বলতা
  • হজম সমস্যা
  • অতিরিক্ত প্রস্রাব

হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলি যদি আপনার মধ্যে দেখা দেয়, তাহলে অবিলম্বে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। ডাক্তার আপনার লক্ষণগুলি পরীক্ষা করে নির্ণয় করবেন এবং উপযুক্ত চিকিৎসা দেবেন।

ঘরোয়া পদ্ধতিতে থাইরয়েড কমানোর উপায়

ঘরোয়া পদ্ধতিতে থাইরয়েড কমানোর জন্য নিম্নলিখিত উপায়গুলি চেষ্টা করতে পারেন:

  • ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খান। ভিটামিন ডি থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবারগুলি হল:
    • দুগ্ধজাত দ্রব্য
    • তিলের বীজ
    • কমলালেবুর রস
    • ডিমের কুসুম
  • আদা চা পান করুন। আদা একটি প্রদাহ-বিরোধী উপাদান যা থাইরয়েডের সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে। আদা চা তৈরি করতে, ১ চা চামচ আদা কুচি এবং ১ কাপ ফুটন্ত পানি একসাথে মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে দিন। তারপর ছেঁকে চা পান করুন।
  • রসুন খান। রসুনও একটি প্রদাহ-বিরোধী উপাদান যা থাইরয়েডের সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন ২-৩ কোয়া রসুন খাওয়ার চেষ্টা করুন।
  • সবুজ শাকসবজি খান। সবুজ শাকসবজিতে ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস থাকে যা থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সবুজ শাকসবজির মধ্যে রয়েছে:
    • পালং শাক
    • ব্রোকলি
    • বাঁধাকপি
    • শালগম
  • প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রক্রিয়াজাত খাবারে ক্ষতিকারক উপাদান থাকে যা থাইরয়েডের সমস্যা কে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিন। ঘুমের অভাব থাইরয়েডের সমস্যা কে বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্রতি রাতে ৭-৮ ঘন্টা ঘুমের চেষ্টা করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন। নিয়মিত ব্যায়াম থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে, হাইপারথাইরয়েডের সমস্যা থাকলে ব্যায়াম করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

এই উপায়গুলি চেষ্টা করার পাশাপাশি, আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করাও গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ডাক্তার আপনার থাইরয়েডের সমস্যার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারবেন।

এখানে কিছু অতিরিক্ত টিপস দেওয়া হল যা আপনাকে ঘরোয়া পদ্ধতিতে থাইরয়েড কমানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে:

  • ধূমপান এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
  • নিয়মিত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • মানসিক চাপ কমাতে চেষ্টা করুন।

আপনি যদি থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন, তাহলে উপরে দেওয়া উপায়গুলি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে, আপনার লক্ষণগুলি যদি অব্যাহত থাকে বা খারাপ হয়, তাহলে অবিলম্বে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখার উপায়

থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে কিছু জীবনযাপনের পরিবর্তনও করা যেতে পারে। যেমন:

  • আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া। আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবারগুলো হল- ডিম, পনির, লবণ, দুধ, সামুদ্রিক খাবার ইত্যাদি।
  • সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া। সেলেনিয়াম থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্যও প্রয়োজনীয়। সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবারগুলো হল- টুনা, মুরগি, ওটমিল, বাদামি চাল, ডিম ইত্যাদি।
  • জিংক সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া। জিংকও থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। জিংক সমৃদ্ধ খাবারগুলো হল- বাদাম, শুকনো ফল, সীফুড, লাল মাংস ইত্যাদি।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা। ব্যায়াম থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • পর্যাপ্ত ঘুমানো। ঘুম থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়।
  • মানসিক চাপ কমানো। মানসিক চাপ থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

থাইরয়েডের সমস্যা হলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এখানে কিছু অতিরিক্ত টিপস দেওয়া হল যা থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে:

  • পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন।
  • ধূমপান এবং অ্যালকোহল পান এড়িয়ে চলুন।
  • নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করুন।
  • আপনার ডাক্তারের সাথে আপনার থাইরয়েডের চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করুন।

থাইরয়েড ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত পুষ্টি উপাদান

থাইরয়েড ডায়েটে নিম্নলিখিত পুষ্টি উপাদানগুলি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত:

  • আয়োডিন: আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য অপরিহার্য। থাইরয়েড হরমোনগুলি শরীরের বিপাক, বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক খাবার, লবণ, ডিম, দুধ এবং পনির।
  • সেলেনিয়াম: সেলেনিয়াম থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে মাছ, মুরগি, বাদাম এবং বীজ।
  • জিংক: জিংকও থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জিংক সমৃদ্ধ খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে বাদাম, শুকনো ফল, মাংস এবং সামুদ্রিক খাবার।
  • ভিটামিন ডি: ভিটামিন ডি থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে সূর্যের আলো, ডিম, সামুদ্রিক খাবার এবং মাশরুম।
  • প্রোটিন: প্রোটিন থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে মাংস, মাছ, ডিম, ডাল এবং বাদাম।
  • ক্যালসিয়াম: ক্যালসিয়াম থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে দুধ, পনির, দই এবং ব্রোকলি।

থাইরয়েড ডায়েটে এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ফল, শাকসবজি এবং পূর্ণ শস্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এই খাবারগুলিতে ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে যা থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক রোগীর থাইরয়েডের অবস্থার উপর ভিত্তি করে একটি ব্যক্তিগতকৃত ডায়েট পরিকল্পনা প্রদান করতে পারেন।

আরো পড়ুনঃ অশ্বগন্ধার উপকারিতা

থাইরয়েড কমানোর উপায়

থাইরয়েডের কার্যকারিতা বাড়াতে যেসব খাবার এড়িয়ে চলা উচিৎ


থাইরয়েডের কার্যকারিতা বাড়াতে যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে সেগুলি হল:

  • গুরুপাক খাবার: থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য থাইরয়েড গ্রন্থিকে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন প্রয়োজন। গুরুপাক খাবার হজম করতে বেশি সময় লাগে, ফলে থাইরয়েড গ্রন্থি অক্সিজেন পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। তাই থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, তেল জাতীয় খাবার, দুগ্ধজাত খাবার, মশলাদার খাবার, কফি, চা, অ্যালকোহল ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিত।
  • গয়টার-সৃষ্টিকারী খাবার: গয়টার হল একটি থাইরয়েডের সমস্যা যাতে থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যায়। গয়টারের কারণ হল থাইরয়েড গ্রন্থির জন্য প্রয়োজনীয় আয়োডিনের অভাব। তবে, অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণও গয়টার সৃষ্টি করতে পারে। তাই গয়টারের সমস্যা থাকলে আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন সামুদ্রিক খাবার, লবণ, ডিম, দুধ, পনির ইত্যাদির পরিমাণ সীমিত করা উচিত।
  • থাইরয়েড হরমোন প্রতিরোধী খাবার: কিছু খাবার থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে বাধা দিতে পারে। এই খাবারগুলি হল সয়াবিন, সয়াজাতীয় খাবার, ক্রস-সিড জাতীয় খাবার যেমন ফুলকপি, ব্রকলি, বাঁধাকপি, ব্রাসেলস স্প্রouts, ইত্যাদি। তাই থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে এই খাবারগুলি এড়িয়ে চলা উচিত।

এছাড়াও, থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক রোগীর থাইরয়েডের অবস্থার উপর ভিত্তি করে একটি ব্যক্তিগতকৃত ডায়েট পরিকল্পনা প্রদান করতে পারেন।

পাঠকের মন্তব্য:

Check Also

ছোলা খাওয়ার উপকারিতা

ছোলা খাওয়ার উপকারিতা: ছোলা কেন আপনার খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত কাঁচা?

ছোলা বাঙালির খাদ্যতালিকার একটি অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে রোজার মাসে ইফতারের পাতে ছোলা থাকতেই হবে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *