Friday , October 22 2021

প্যারিসের হাজারো মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন যে আলেমের হাতে

হায়দরাবাদ রাজ্যের প্রয়াত ইসলামী চিন্তাবিদ ও প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ। হাদিস, ফিকাহ, ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্বের বিদগ্ধ এ পণ্ডিত ইউরোপের বুকে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রচার-প্রসারে একজন নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। প্যারিসে পাঁচ দশক অবস্থানকালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন তিনি। এ সময় তাঁর হাতে ৪০ হাজারের বেশি লোক ইসলাম গ্রহণ করেন বলে মনে করা হয়। ২৩ ভাষায় পারদর্শী মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাত ভাষায় ২৫০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেন।

হায়দরাবাদের প্রখ্যাত আলেম ও মালয়েশিয়ার ইসলামিক সাইন্স ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. আবদুল মাজিদ ঘুরি বহুভাষাবিদ ও বিংশ শতাব্দীর ইসলামী চিন্তানায়ক ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহকে ‘ইউরোপে ইসলামের দূত ও ইসলামী ঐতিহ্যের অগ্রনায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেন।

জন্ম ও পরিবার : ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ১৯০৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হায়দরাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের ‘নাওয়ায়েত’ শাখার সঙ্গে মিলিত হয়, যারা মদিনা থেকে বসরায় গিয়ে বসবাস শুরু করেছিল। এরপর হিজরি অষ্টম শতাব্দীতে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে তাঁর পূর্বপুরুষ ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে ইসলামী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় ব্যাপক অবদান রাখেন।

উচ্চশিক্ষিত পরিবার : তাঁর প্রতিপিতামহ মাওলানা মুহাম্মদ গাউস শরিফুল মুলুক আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় ৩০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর দাদা কাজি মুহাম্মদ সিবগাতাল্লাহ ছিলেন একজন খ্যাতিমান আলেম ও বিচারক। তিনি মাদ্রাজের (বর্তমান চেন্নাই) প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পিতা মুফতি আবু মুহাম্মদ খলিলুল্লাহ একজন ইসলামী আইনজ্ঞ ছিলেন। হায়দরাবাদের নিজাম সরকারের রাজস্ব বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি হায়দরাবাদে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ ছিলেন।

মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর ভাই শায়খ হাবিবুল্লাহ নবম শতাব্দির ঐতিহাসিক আল বালাজুরি (রহ.) লিখিত ‘আনসাবুল আশরাফ’ গ্রন্থ উর্দু ভাষায় অনুবাদ করেন। তাঁর বড় বোন আমাতুল আজিজ বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আল মিনহাজ ফি শরহি সহিহ মুসলিম’ উর্দু ভাষায় অনুবাদ করেন।

লেখাপড়া : ১৯২৩ সালে মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ হায়দরাবাদের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। ১৯২৮ সালে পড়াশোনা শেষ করে উসমানীয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে স্নাতক করেন। এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী আইন বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণার কাজে তিনি হিজাজ, মিসর, সিরিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। তখন অনেক প্রভাবশালী প্রাচ্যবিদদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এরপর বৃত্তি নিয়ে জার্মানির বন ইউনিভার্সিটে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৩২ সালে সেখান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর পিএইচডি ডিগ্রির শিরোনাম ছিল, ‘ইসলামের আন্তর্জাতিক আইনে নিরপেক্ষতা’। এ সময় তিনি আরবি ও উর্দু ভাষার খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও করেন। ১৯৩৪ সালে জার্মানির সরবন ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এসময় তাঁকে ডি.লিট উপাধী দেওয়া হয়। তাঁর বিষয় ছিল, ‘মহানবী ও খলিফাদের যুগের কূটনৈতিক নথিপত্র’।

মনীষীদের সান্নিধ্য : ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ তৎকালীন সময়ের বিশ্বখ্যাত আলেম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা মানাজির আহসান গিলানি (রহ.), মাওলানা আবদুল হক, অধ্যাপক আবদুল কাদির সিদ্দিকী, অধ্যাপক আবদুল মজিদ সিদ্দিকী বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।

কর্মজীবনে প্রবেশ : হায়দরাবাদে ফিরে এসে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ উসামানীয় ইউনিভার্সিটিতে ধর্ম বিভাগে অতঃপর আন্তর্জাতিক আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি হায়দরাবাদ সরকারের প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র হয়ে জাতিসংঘের সমর্থন লাভে লন্ডন ও নিউ ইয়র্কে যান। সেখানে তিনি ভারতের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে হায়দরাবাদের নিজাম সরকারের স্বাধীনতা কামনা করেন। কিন্তু প্রতিনিধি দলের আলোচনা কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই জোরপূর্বক হায়দরাবাদ দখল করে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। অতঃপর প্রতিনিধি দলের সব সদস্য হায়দরাবাদে ফিরে এলেও ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

প্যারিসে ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা বৃত্তি নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটিসহ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। তিনি ছিলেন প্যারিসে থাকা তৎকালীন হায়দরাবাদ রাজের সর্বশেষ নাগরিক। প্রবাস জীবনে ফ্রান্স ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ তাঁকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দানের প্রস্তাব দিলেও তিনি হায়দরাবাদের বাস্তুচ্যুত নাগরিক হিসেবে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা কারিকুলাম ও সংবিধান রচনায় অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তিনি আল্লাম শিবলি নুমানি (রহ.) ও মুফতি শফি (রহ.)-এর নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান কমিটিতে কাজ করেন। তবে সরকারের সদিচ্ছা ও ধার্মিকতার অভাব লক্ষ্য করে তিনি এ সংবিধান বাস্তবায়নে বেশ সন্দিহান ছিলেন। অবশ্য নিজদেশে জীবদ্দশায় আর না ফিরলেও তিনি বরেণ্য আলেম ও গবেষকদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রাখতেন।

হিজরতের চতুর্দশ শতাব্দি পূর্তি উপলক্ষে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আমন্ত্রণে পাঞ্জাবের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি বাহাওয়ালপুরের মহানবী (সা.)-এর জীবনী নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিলাল-ই-ইমতিয়াজে ভূষিত হন। সম্মাননা পুরস্কারের বিশাল অংকের অর্থ তিনি ইসলামাবাদের ইসলামিক রিসার্চ একাডেমিকে দান করেন। তিনি বলেন, ‘আমি নশ্বর পৃথিবীতে এই পুরস্কার নিয়ে ফেললে চিরস্থায়ী আখেরাতে কী পুরস্কার গ্রহণ করব?’

ইসলামে বিভিন্ন শাখায় অসাম্য অবদান রাখায় ১৯৯৪ সালে আরববিশ্বের বিখ্যাত কিং ফয়সাল পুরুস্কারের জন্য মনোনীত হন। কিন্তু পুরস্কার প্রদানকারী কমিটিকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি অবিহিত করেন। তিনি বলেন, আমি যা লিখেছি এসব কিছু একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য লিখেছি। অতএব তোমরা আমার দ্বিনকে বিনষ্ট করো না।’

গবেষণাকর্ম : ব্যক্তিজীবনে মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ বিয়ে করেননি। তবে ইসলামের নানা বিষয়ে অসংখ্য একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমে তিনি মুসলিমদের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ২৩ ভাষায় পারদর্শী মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ আরবি, জার্মানি, উর্দু, ফ্রেঞ্চ, তুর্কি, ফার্সি, ইংরেজিসহ মোট সাতটি ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ রচনাসম্ভার উপহার দেন।

প্রথম মুসলিম হিসেবে ফরাসি ভাষায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদ করেন, যা অদ্যাবধি মানোত্তীর্ণ অনুবাদ হিসেবে মনে করা হয়। প্যারিসে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করেন। সেখানকার মুসলিম শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের নিয়ে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যারা ইসলাম মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা চালাবে।

মৃত্যু : ১৯৯৬ সালে মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রোরিডা রাজ্যের জ্যাকসনভিলে চলে আসেন। সেখানে বসবাসরত তাঁর ভাইয়ের নাতনি সাদিদাহ আতাউল্লাহর বাসায় জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকেন। ২০০২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিশ্বখ্যাত এ ইসলামী পণ্ডিত ইন্তেকাল করেন।

উল্লেখযোগ্য রচনাবলি : ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়াও জার্মানি ও ফ্রান্সের গবেষণা জার্নালের তাঁর অসংখ্যা গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলির নাম নিম্নে তুলে ধরা হলো –

১- দ্য মুসলিম কনডাক্ট অব স্টেট : বিং অ্যা ট্রিটেজ অন সিয়ার ২- দ্য ফাস্ট রিটেন কন্সটিটিউশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ৩- ইসলামিক ন্যাশন অব কনফ্লিক্ট অব ল ৪- ইনট্রডাকশন টু ইসলাম

৫- ইসলাম : অ্যা জেনারেল পিকচার ৬- দ্য প্রোফেটস স্ট্যাবলিশিং এ স্টেট এন্ড হিস সাকসেশন ৭- দ্য প্রোফেট অব ইসলাম : প্রোফেট অব মাইগ্রেশন ৮- ব্যাটলফিল্ড অব দ্য প্রোফেট মুহাম্মদ ৯- ইমারজেন্স অব ইসলাম ১০- দ্য লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক অব দ্য প্রোফেট অব ইসলাম

পাঠকের মন্তব্য:

Check Also

পানি নয়, কাঁদলে চোখ দিয়ে পাথর ঝরে কিশোরীর!

কাঁদলে চোখ থেকে পানি নয়, পাথর ঝরে। এমনই অদ্ভূত ঘটনা ঘটেছে ভারতের উত্তরপ্রদেশে। ১৫ বছরের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *